
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী বাংলা সাহিত্যের এমন একটি উপন্যাস, যাকে শুধু গল্প হিসেবে পড়া কঠিন। এটি গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি, দারিদ্র্যের নির্মমতা, শৈশবের কৌতূহল এবং খুব সাধারণ মানুষের গভীর মানবিকতার এক অসাধারণ দলিল।
উপন্যাসের কেন্দ্রে অপুর পরিবার—হরিহর, সর্বজয়া, দুর্গা এবং পরে অপু। তাদের সংসারে অভাব আছে, অনিশ্চয়তা আছে, কিন্তু সেই অভাবের ভেতরেও জীবন থেমে থাকে না। বরং ছোট ছোট আনন্দ, প্রকৃতি, কৌতূহল এবং সম্পর্কের উষ্ণতা বারবার গল্পটিকে আলোকিত করে।
দুর্গা ও অপুর চোখে পৃথিবী
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শিশুচোখের বিস্ময়। দুর্গা আর অপুর কাছে গ্রামের পথ, কাশবন, দূরের ট্রেন, বৃষ্টি কিংবা মেলা—সবকিছুই আবিষ্কারের মতো। পাঠকও তাদের সঙ্গে সেই পৃথিবী নতুন করে দেখতে শেখে। যে দৃশ্য একজন প্রাপ্তবয়স্কের কাছে সাধারণ, শিশুর কাছে সেটিই হয়ে ওঠে বিস্ময়কর।
দারিদ্র্য আছে, কিন্তু করুণা চাওয়া নেই
পথের পাঁচালী দারিদ্র্যের গল্প হলেও লেখক চরিত্রগুলিকে কখনও করুণার বস্তু করে তোলেন না। সর্বজয়ার ক্লান্তি, হরিহরের স্বপ্ন, দুর্গার স্বাধীন স্বভাব—সবকিছুই তাদের পূর্ণ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। অভাব তাদের জীবনকে কঠিন করে, কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্বকে মুছে দেয় না।
প্রকৃতি যেন আরেকটি চরিত্র
বিভূতিভূষণের প্রকৃতি বর্ণনা শুধু দৃশ্য সাজানোর জন্য নয়। ঋতু, পথ, পুকুর, গাছপালা, আলো, বাতাস—সব মিলিয়ে গ্রামটি যেন উপন্যাসের আরেকটি জীবন্ত চরিত্র। এই প্রকৃতির মধ্যেই অপুর কল্পনা বড় হয় এবং পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী একটি আবহ তৈরি করে।
কেন এখনও পড়া জরুরি
সময়ের সঙ্গে জীবন বদলেছে, কিন্তু অপুর বিস্ময়, সর্বজয়ার দুশ্চিন্তা, হরিহরের আশা কিংবা দুর্গার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আজও অপরিচিত নয়। পরিবারের টানাপোড়েন, স্বপ্ন আর বাস্তবতার সংঘাত—এসবই বইটিকে আজও জীবন্ত রাখে।
পথের পাঁচালী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় গল্প সবসময় বড় ঘটনার মধ্যে জন্মায় না। কখনও একটি কাশবন, একটি দূরের ট্রেন, একটি হারিয়ে যাওয়া বিকেল কিংবা একটি শিশুর চোখই একটি পুরো পৃথিবী তৈরি করতে পারে।